ইউনূস আমলে হামের টিকার অনিয়ম তদন্তে কমিশন গঠন
অনলাইন নিউজ ডেক্স
ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে হামের টিকা কেনা ও বিতরণে বিলম্ব, অনিয়ম এবং প্রশাসনিক ব্যর্থতার অভিযোগ তদন্তে তিন সদস্যের কমিশন গঠন করেছে সরকার। ২০২৪ সালের ৮ই আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের ১৭ই ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত টিকা সংগ্রহ ও বিতরণে কী ধরনের অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা হয়েছে এবং এর জন্য কারা দায়ী, তা চিহ্নিত করবে কমিশন। আগামী ৬০ কর্মদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।
গতকাল বুধবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের এক প্রজ্ঞাপনে এ সিদ্ধান্ত জানানো হয়।
কমিশনের সভাপতি করা হয়েছে হাইকোর্ট বিভাগের সাবেক বিচারপতি মামনুন রহমানকে। অন্য দুই সদস্য হলেন বাংলাদেশ কলেজ অব ফিজিশিয়ানস অ্যান্ড সার্জনসের (বিসিপিএস) প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক ডা. মওদুদ হোসেন আলমগীর এবং স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব এ এন এম মঈনুল ইসলাম।
কমিশন হামের টিকা কেনা ও বিতরণে বিলম্বের কারণ, ক্রয় ও সরবরাহ প্রক্রিয়ায় অনিয়ম এবং প্রশাসনিক ব্যর্থতার জন্য দায়ী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান চিহ্নিত করবে। পাশাপাশি জনস্বাস্থ্যের ওপর এর প্রভাব পর্যালোচনা করে ভবিষ্যতে এ ধরনের পরিস্থিতি প্রতিরোধে সুপারিশ দেবে।
তদন্তের প্রয়োজনে দেশের যেকোনো স্থান পরিদর্শন এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের তলব ও জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারবে কমিশন। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ প্রয়োজনীয় সাচিবিক সহায়তা দেবে।
টিকা কেনার পদ্ধতি পরিবর্তনে সংকট
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে টিকা সংকটের অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে এসেছে ক্রয়পদ্ধতি পরিবর্তন, সিদ্ধান্ত গ্রহণে দীর্ঘসূত্রতা এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার সতর্কবার্তায় যথাসময়ে সাড়া না দেওয়ার বিষয়টি। ২০২৪ সাল পর্যন্ত শিশুদের নিয়মিত টিকা ইউনিসেফের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থা থেকে কেনা হতো।
এ ব্যবস্থায় আন্তর্জাতিক সংস্থার সহায়তা ও দাতাদের অর্থায়ন যুক্ত ছিল। তবে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে অন্তর্বর্তী সরকার এ পদ্ধতি পরিবর্তন করে উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে টিকা কেনার সিদ্ধান্ত নেয়। নতুন ব্যবস্থায় জাতীয় রাজস্ব বাজেট থেকে টিকা কেনার অর্থ দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়।
পদ্ধতি পরিবর্তনের আগে ও পরে ইউনিসেফ সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা জানায়। সংস্থাটির বাংলাদেশ প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্সের ভাষ্য অনুযায়ী, টিকা সংকটের বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষকে একাধিকবার সতর্ক করা হয়েছিল।
এ নিয়ে পাঁচ থেকে ছয়টি চিঠি পাঠানোর পাশাপাশি অন্তত ১০টি বৈঠকে বিষয়টি তুলে ধরা হয়। টিকা সংগ্রহের পদ্ধতি পরিবর্তন না করার অনুরোধও জানানো হয়েছিল। তবে এসব সতর্কবার্তার পরও নতুন ক্রয়পদ্ধতি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
পরে উন্মুক্ত দরপত্রে টিকা কেনার প্রক্রিয়ায় প্রশাসনিক ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা তৈরি হয়। আন্তর্জাতিক গুদামে টিকা মজুদ থাকলেও প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও অর্থছাড়ে বিলম্বের কারণে সেগুলো দেশে আনা সম্ভব হয়নি। একপর্যায়ে আবার ইউনিসেফের মাধ্যমে টিকা কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তবে ততদিনে নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রমে ঘাটতি তৈরি হয়েছিল।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরও উন্মুক্ত দরপত্রে টিকা কেনার প্রক্রিয়াকে দীর্ঘ ও ঝুঁকিপূর্ণ উল্লেখ করে ইউনিসেফের মাধ্যমে সরবরাহ অব্যাহত রাখার সুপারিশ করেছিল।
এদিকে ২০২৪ সালে অনুষ্ঠেয় বিশেষ হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি রাজনৈতিক অস্থিরতায় পিছিয়ে ২০২৫ সালে আয়োজনের পরিকল্পনা করা হলেও শেষ পর্যন্ত তা বাস্তবায়িত হয়নি। নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রমেও বিভিন্ন সময়ে বিঘ্ন ঘটে। ফলে বিপুলসংখ্যক শিশু সময়মতো টিকা পাওয়া থেকে বঞ্চিত হয়। এতে শিশুদের মধ্যে রোগ প্রতিরোধক্ষমতার ঘাটতি তৈরি হওয়ায় পরবর্তী সময়ে হামের প্রাদুর্ভাবের ঝুঁকি বাড়ে।
স্বাস্থ্য উপদেষ্টার যোগ্যতা ও নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক
অন্তর্বর্তী সরকারের স্বাস্থ্য খাতের দায়িত্বে থাকা উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমের নিয়োগ নিয়েও সে সময় প্রশ্ন ও বিতর্ক তৈরি হয়। ইউনূসের দীর্ঘদিনের সহযোগী নূরজাহান বেগম ১৯৭৬ সালে গ্রামীণ ব্যাংক প্রকল্পের শুরু থেকেই তাঁর সঙ্গে কাজ করেন। পরবর্তী সময়ে ব্যাংকটির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি ২০১১ সালে ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্বও পালন করেন।
নূরজাহান বেগম চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। গ্রামীণ ব্যাংকে দীর্ঘ কর্মজীবন ও প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা থাকলেও চিকিৎসা, চিকিৎসাবিজ্ঞান বা জনস্বাস্থ্য বিষয়ে তাঁর কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাগত যোগ্যতার তথ্য পাওয়া যায় না।
এ অবস্থায় স্বাস্থ্যবিষয়ক পেশাগত যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার চেয়ে ইউনূসের সঙ্গে দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠতা তাঁর নিয়োগে বেশি গুরুত্ব পেয়েছিল কিনা, তা নিয়ে সমালোচনা তৈরি হয়।
২০২৫ সালের ২৩শে জুলাই জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) দক্ষিণাঞ্চলের প্রধান সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ এক সমাবেশে নূরজাহান বেগমের নিয়োগকে ইউনূসের স্বজনপ্রীতির উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন। তাঁর অভিযোগ, গ্রামীণ ব্যাংকের সঙ্গে সম্পৃক্ততা ও ইউনূসের ঘনিষ্ঠতাই ছিল নূরজাহান বেগমের স্বাস্থ্য উপদেষ্টা হওয়ার প্রধান যোগ্যতা। এ নিয়োগের সমালোচনা করে তিনি উপদেষ্টার পদত্যাগও দাবি করেন।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা
টিকা কেনার পদ্ধতি পরিবর্তন ও তা বাস্তবায়নে তৎকালীন স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগম এবং প্রধান উপদেষ্টার স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী অধ্যাপক সায়েদুর রহমানের ভূমিকা আলোচনায় এসেছে। উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে টিকা কেনার উদ্যোগের পক্ষে ছিলেন অধ্যাপক সায়েদুর রহমান।
অন্যদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের একটি অংশ ইউনিসেফের মাধ্যমে সরাসরি টিকা কেনার পক্ষে অবস্থান নেন।
২০২৫ সালের ৩০শে অক্টোবর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) এ বি এম আবু হানিফ স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিবকে চিঠি দিয়ে উন্মুক্ত দরপত্রের জটিলতা তুলে ধরেন এবং ইউনিসেফের মাধ্যমে টিকা কেনার পক্ষে যুক্তি দেন। ইউনিসেফের প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্সও একাধিকবার তৎকালীন স্বাস্থ্য উপদেষ্টাকে টিকা সরবরাহের ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক করেছিলেন।
তবে ক্রয়পদ্ধতি পরিবর্তন ও পরবর্তী প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে কার কী ভূমিকা এবং দায় কতটুকু ছিল, তা এখনো তদন্তে প্রমাণিত হয়নি। কমিশন এসব বিষয় খতিয়ে দেখবে।
হামের প্রাদুর্ভাব ও শিশু মৃত্যু
টিকা সংগ্রহ ও বিতরণে দীর্ঘসূত্রতার প্রভাব চলতি বছর হামের প্রাদুর্ভাবের সময় প্রকট হয়ে ওঠে। গত ১৫ মার্চ থেকে দেশে হামের সংক্রমণ ও উপসর্গ নিয়ে শিশু মৃত্যুর ঘটনা বাড়তে থাকে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গত এপ্রিল থেকে জরুরি টিকাদান কর্মসূচি শুরু করে সরকার। তবে ততদিনে সংক্রমণ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত বুধবার পর্যন্ত দেশে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে মোট ১ হাজার ২৬৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে নিশ্চিতভাবে হামে মারা গেছে ১০৫ জন এবং হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে ১ হাজার ১৬৪ জনের।
একই সময়ে সন্দেহভাজন রোগী হিসেবে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ২ লাখ ৮ হাজার ৬৩৪ জন।
এ পরিস্থিতিতে টিকা সংগ্রহ ও বিতরণে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কার সিদ্ধান্ত, প্রশাসনিক ব্যর্থতা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দায়দায়িত্ব নির্ধারণে তদন্ত কমিশন গঠন করা হলো।
