সুনামগঞ্জে যুদ্ধাপরাধের মামলার সাক্ষীর বাড়িঘর ভাঙচুর-লুটপাট, নারীদের শ্লীলতাহানী-তাণ্ডব চালাল রাজাকারের দোসররা


সুনামগঞ্জে যুদ্ধাপরাধের মামলার সাক্ষীর বাড়িঘর ভাঙচুর-লুটপাট, নারীদের শ্লীলতাহানী-তাণ্ডব চালাল রাজাকারের দোসররা
সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলার দৌলতপুর গ্রামে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার এক সাক্ষীর বাড়ি ও দোকানে হামলা, ভাঙচুর এবং লুটপাট এবং ওই পরিবারের নারীদের শ্লীলতাহানী করেছে একাত্তরের মাতবতাবিরোধী মামলার আসামির স্বজনেরা। এ সময় পরিবারের নারীদের মারধর ও শ্লীলতাহানির পাশাপাশি এক নারী ও তাঁর ১২ বছর বয়সী মেয়েকে ধর্ষণচেষ্টাও করেছে তারা। হামলায় গর্ভবতী নারীসহ পরিবারের পাঁচজন আহত হয়েছেন। তাঁদের শাল্লা ও দিরাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। এ ঘটনার পর মামলার সাক্ষী ও একাত্তরের শহিদ সন্তান দুলাল মিয়াকে খুঁজে পাচ্ছেন না তাদের স্বজনরা। হামলার পর বসবাসস্থল গুঁড়িয়ে দেওয়ায় গ্রাম ছেড়ে চলে গেছেন ভুক্তভোগীরা। হামলায় আহত গর্ভবর্তী কুলসুমা আক্তার সংকটাপন্ন অবস্থায় দিরাই উপজেলা হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। গত ২৯শে অক্টোবর রাত ১২টার দিকে উপজেলার আটগাঁও ইউনিয়নের দৌলতপুর গ্রামে এমন নির্মম হামলার ঘটনা ঘটে। হামলাকারীরা নগদ ৪ লাখ টাকা, দুই ভরি স্বর্ণালংকার, ছয়টি গরু, চারটি ফ্রিজসহ মূল্যবান মালামাল লুট করে নিয়ে গেছে। ঘটনার পর নিরাপত্তাহীনতায় পরিবারের সদস্যরা বাড়িঘর ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছেন। ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা জানান, হামলাকারীরা শাল্লা উপজেলার একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার আসামি তোতা মিয়া টেইলার, ইমাম জলিলের স্বজন। এছাড়া এই গ্রামের সন্তান জামায়াত নেতা অ্যাডভোকেট শিশির মনিরেরও ঘনিষ্টজন তারা। শিশির মনিরের বাবা রাজাকার মুকিত মনির এই মামলার আসামি এবং আক্রান্ত দুলাল মিয়া এই মামলারই সাক্ষী। ২০১৬ সালে যুদ্ধাপরাধ মামলা হলে দুলাল মিয়া তার বাবা শহিদ মামদ আলী ও শহিদ ৭ জনের পরিবারের সদস্য হিসেবে সাক্ষী হয়েছিলেন। পড়ুন: পেরুয়া গণহত্যা দিবস: শিশির মনিরের বাবা-চাচার নেতৃত্বে ধর্মান্তরিত করে ব্রাশফায়ারে হত্যা করা হয় ২৬ জনকে পড়ুন: সাবেক এমপি নাছির চৌধুরী: শিশির মনির কুখ্যাত রাজাকারের ছেলে, তার পুরো পরিবার গণহত্যায় জড়িত এই মামলার আসামি শিশির মনিরের বাবা রাজাকার মুকিত মনির মামলার পর পালিয়ে আমেরিকা চলে যান। দুলাল মিয়া ও তার পরিবারের অভিযোগ একাত্তরের যুদ্ধাপরাধ মামলার সাক্ষী হওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে পরিবারটি নানাভাবে হুমকি ও হয়রানির শিকার হয়ে আসছে। স্থানয় সূত্র ও ভুক্তভোগীদের ভাষ্য অনুযায়ী, হামলার শিকার দুলাল মিয়ার বাবা একাত্তরে শহিদ হন। তাঁর দাদা মামদ আলীসহ পরিবারের সাতজন সদস্য ওই সময় শহিদ হন এবং এই পরিবারের ৫ জন নারী নির্যাতিত হন। ২০১৬ সালে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা হলে দুলাল মিয়া ওই মামলার সাক্ষী হন। মামলাটিতে অভিযুক্তদের মধ্যে হামলায় নেতৃত্ব দেওয়ার অভিযোগ ওঠা জালাল মিয়ার চাচা তোতা মিয়া টেইলারসহ পাঁচজন গ্রেপ্তার হয়ে কারাভোগও করেছিলেন। দুলাল মিয়ার মেয়ে উজ্জলা আক্তার বলেন, একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের মামলায় সাক্ষী হওয়ার পর থেকেই আমাদের পরিবার আতঙ্কের মধ্যে বসবাস করছে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের ৫ই আগস্টের পর সেই আতঙ্ক আরও বেড়েছে। গ্রামের আরও কয়েকটি সাক্ষী পরিবার নিরাপত্তাহীনতায় এলাকা ছেড়ে চলে গেলেও তারাইকেবল বাড়িতে ছিলেন। শিশির মনির তাঁর স্বামী হেলাল মিয়া গ্রামে একটি দোকান পরিচালনা করেন। ওই দোকানেও বিভিন্ন সময় হয়রানি, চাদাবাজি ও হুমকির ঘটনা ঘটে আসছে বলে জানান তিনি। উজ্জলা আরও জানান, গত ২৩শে অক্টোবর তাঁদের দোকানে চুরির ঘটনা ঘটে। বিষয়টি শাল্লা থানা পুলিশকে জানালে গত ২৯শে অক্টোবর পুলিশ সরেজমিনে তদন্তে আসে। পুলিশ কেন তাঁদের দোকানে তদন্ত করতে এসেছে, এ নিয়ে হামলাকারীরা প্রশ্ন তোলে এবং পুলিশের সঙ্গে তর্কে জড়ায়। এর কয়েক ঘণ্টা পর রাত ১২টার দিকে তাঁদের বাড়ি ও দোকানে হামলা চালানো হয়। হামলার সময় তার ভাইর বউ কুলসুম আক্তার- যিনি গর্ববর্তী, তিনি আহত হন। এখন দিরাই হাসপাতালে সংকটাপন্ন অবস্থায় আছেন তিনি। ডাক্তাররা তাকে ও সন্তানকে বাঁচাতে উন্নত চিকিৎসার জন্য বলেছেন। ভুক্তভোগীরা জানান, যুদ্ধাপরাধী রাজাকার তোতা টেইলার, ইমাম জলিল ও মুকিত মনিরের স্বজন জালাল মিয়া ও শাহিন মিয়ার নেতৃত্বে তোফাজ্জল মিয়া, হেকিম মোড়ল, সুলতান, রাজ্জাক, তারেক, শামীম, নূর ইসলামসহ ১৫ থেকে ২০ জন ওই হামলায় অংশ নেন। এ সময় তাঁরা বসতঘর ও দোকানে ভাঙচুর চালিয়ে আসবাবপত্র তছনছ করেন এবং নগদ টাকা, স্বর্ণালংকার, দোকানের মালামাল ও গবাদিপশু লুট করে নিয়ে যান। লুট হওয়া মালামালের মধ্যে চারটি ফ্রিজ, ছয়টি গরু, দুই ভরি স্বর্ণালংকার ও নগদ চার লাখ টাকা রয়েছে। হামলাকারীরা পরিবারটিকে গ্রাম ছেড়ে চলে যাওয়ার হুমকিও দিয়ে যায়। হামলার সময় ফাতেমা বেগম, ফরিদা বেগম ও রোকেয়া বেগমকে মারধর এবং শ্লীলতাহানির চেষ্টা করা হয় বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা। আহতদের মধ্যে চারজন শাল্লা ও দিরাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এবং কুলসুমা আক্তার দিরাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিচ্ছেন। এর মধ্যে গর্ভবর্তী কুলসুম বেগমের অবস্থা আশঙ্কাজনক। একাত্তরে গণহত্যা চালানো হয়েছিল পেরুয়াতে আহত ফাতেমা বেগম বলেন, আমার স্বামী দুলাল মিয়া একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের মামলার সাক্ষী হওয়ায় অভিযুক্ত ব্যক্তিরা দীর্ঘদিন ধরে তাঁদের ওপর নির্যাতন চালিয়ে আসছে। বিশেষ করে ৫ই আগস্টের পরে আমরা আতঙ্কে আছি। গত বৃহস্পতিবার রাতে দেশীয় অস্ত্র নিয়ে হামলাকারীরা আমাদের বাড়ি ও দোকানে হামলা চালিয়ে মারধর এবং লুটপাট করে। হামলার পর আমার স্বামীকে খুঁজে পাচ্ছিনা। আমার ছেলের বউ গর্ভবর্তী কুসসুমের অবস্থা খারাপ। উজ্জলা বেগম বলেন, আমার দাদা মামদ আলীসহ পরিবারের ৭ জন একাত্তরে শহিদ হয়েছিলেন। তিনি জানান, তাঁদের পরিবার বীরাঙ্গনা পরিবারের সদস্য এবং যুদ্ধাপরাধের মামলার সাক্ষী হওয়ায় জালাল মিয়ার নেতৃত্বে তাঁদের বাড়ি ও দোকানে হামলা চালানো হয়েছে। হামলাকারীরা তাঁকে ও তাঁর ১২ বছর বয়সী মেয়েকে ধর্ষণের চেষ্টা করেছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। তাঁদের বসতভিটা থেকে উচ্ছেদ করতেই এ হামলা চালানো হয়েছে জানান তিনি। উজ্জলা বেগমের স্বামী হেলাল মিয়া বলেন, হামলার খবর পেয়ে তিনি সুনামগঞ্জ শহর থেকে দৌলতপুর গ্রামে গিয়ে দেখেন, তাঁর দোকান তছনছ করা হয়েছে। বাড়ি ও দোকানের মালামাল লুট করে নিয়ে গেছে হামলাকারীরা। ঘটনার সময় বাড়িতে কোনো পুরুষ সদস্য ছিলেন না। দেশীয় অস্ত্র নিয়ে হামলাকারীরা বাড়ি ও দোকানে ভাঙচুর ও লুটপাট চালায় বলে অভিযোগ করেন তিনি। এখন মামলা করলে তাদেরকে খুন করা হবে বলে হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি। অভিযুক্ত জালাল মিয়ার মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। শাল্লা থানার ওসি মোহাম্মদ সোহেল হামলা লুটপাটের কথা স্বীকার করে বলেন, হামলা ও লুটপাটের খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে ভাঙচুরের আলামত সংগ্রহ করেছে। বৃহস্পতিবার রাতে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। ভুক্তভোগীদের মামলা করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। আহতদের নিয়ে হাসপাতালে থাকায় মামলা করতে তাঁদের কিছুটা বিলম্ব হয়েছে। এ ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।