এখনো জ্বলছে আগুন, বিষাক্ত বর্জ্যে একাকার সড়ক


এখনো জ্বলছে আগুন, বিষাক্ত বর্জ্যে একাকার সড়ক
চট্টগ্রামের কর্ণফুলিতে এস আলম সুগার মিলের গুদামে লাগা আগুন প্রায় তিনদিনেও (৬৪ ঘণ্টা) পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। সকাল ৮টাতেও দেখা গেছে মিলের ভেতরে থেমে থেমে আগুন জ্বলছে। এ আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে আরও সময় লাগবে বলে জানায় ফায়ার সার্ভিস। সুগার মিলের গুদামে দেয়াল ফুটো করে দেয়ায় চিনিপোড়া রাসায়নিক বর্জ্য সড়কে এসে পড়ছে। এতে চলাচলে সমস্যা ছাড়াও বেজায় ভোগান্তিতে পড়েছেন পথচারী ও স্থানীয়রা। এর আগে, বুধবার (৬ মার্চ) সকাল ১১টা পর্যন্ত ৪২ ঘণ্টাতেও এস আলম সুগার মিলের ভেতরে আগুনের দাপট কমেনি। এতে আগুন বাইরে ছড়িয়ে পড়ার শঙ্কামুক্ত থাকলেও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে আরও সময় লাগবে বলে জানান ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা। সরেজমিনে দেখা যায়, এস আলম সুগার মিলের পূর্বদিকের দেয়ালে ১০টি ফুটো করে দেয়া হয়েছে। এতে ওই কারখানার পোড়া রাসায়নিক বর্জ্য পড়ে বাংলাবাজারঘাট সড়ক একাকার হয়ে গেছে। এতে ওই সড়কে যাতায়াতে সমস্যা ছাড়াও নানান ভোগান্তিতে পড়েছেন পথচারীরা। বর্জ্যের কারণে কর্ণফুলি নদীর পানির রং তামাটে বর্ণ ধারণ করেছে। বেশি মাত্রায় পোড়া চিনি নদীতে পড়ার কারণে এর জীববৈচিত্র্য এখন হুমকির মুখে। এর মধ্যে কিছু মরা মাছ, কিছু দুর্বল হয়ে মৃতপ্রায় অবস্থায় ভেসে উঠছে। এ ছাড়াও কাঁকড়া, সাপ ও ব্যাঙসহ আরও জলজ প্রাণী বিভিন্ন অংশে মরে পড়ে থাকতে দেখেছেন স্থানীয়রা। অপরিশোধিত চিনি পুড়ে বিষাক্ত কেমিক্যালে রূপ নিয়ে নদী দূষণ হচ্ছে। যার কারণে নদীর মাছসহ সব ধরনের জলজ প্রাণীর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা জানান, চিনির দাহ্য পদার্থ যখন ৩৮০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে থাকে, তখন বিষাক্ত কেমিক্যালে রূপ নেয়। আর সেখানে পানি ছাড়া হলে অক্সিজেন ও হাইড্রোজেন কার্বন তৈরি হয়। যার কারণে কারখানায় আগুন দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে। সেই আগুনে অপরিশোধিত চিনি গলে লাভা নদীতে এসে পড়ে। এতেই পানি দূষিত হয়ে মাছ মরছে। চিনির কেমিক্যালে নদী দূষণতো হয়েছেই; এছাড়া নদী দূষণের অন্যতম কারণ হলো ১৭টি খালের বর্জ্য ওই নদীতে এসে পড়ছে। স্থানীয় সাহাত মিয়া ও চাঁন মিয়া জানান, সুগার মিলের গুদামে চিনি পোড়া রাসায়নিক বর্জ্য কর্ণফুলি নদীতে পড়ে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এছাড়া মিলের গুদাম ফুটো করায় বিষাক্ত বর্জ্য সড়কে এসে পড়ছে। এতে চলাচলে সমস্যা হচ্ছে। গুদামের এ দূষিত পানি শরীরে লাগলে চুলকানি ও চর্মরোগও হওয়ার আশঙ্কা করছেন তারা। এদিকে, চট্টগ্রাম ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তা সহকারী পরিচালক এম ডি আবদুল মালেক জানান, চিনির গুদামের আগুন আর বাইরে ছড়িয়ে পড়ার শঙ্কা নেই। তবে ভেতরে এখনো থেমে থেমে আগুন জ্বলছে। পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে আরও সময় লাগবে। তিনি বলেন, সুগার মিলের চিনির কাঁচা রাসায়নিকের পোড়া গলিত বর্জ্য কারখানার ড্রেন দিয়ে সোজা কর্ণফুলিতে গিয়ে পড়ছে। এতে নদীর পানিতে বিষাক্ত কেমিক্যাল মিশে মরে ভেসে উঠছে মাছ। এছাড়া চারদিক থেকে গুদাম বদ্ধ থাকায় বর্জ্য দ্রুত বের হতে পারছে না। তাই দেয়ালে ১০টি ফুটো করা হয়েছে। সেখান থেকে গুদামের বিষাক্ত রাসায়নিক লাভা বের হচ্ছে। নদী ও খালরক্ষা কমিটির চট্টগ্রাম অঞ্চলের সাধারণ সম্পাদক আলীউর রহমান সময় সংবাদকে বলেন, চট্টগ্রাম শহরের ৭০ লাখ মানুষের বর্জ্য ও দেড় শতাধিক কারখানার রাসায়নিক বর্জ্য কর্ণফুলি নদীতে পড়ার কারণে এটি দেশের অন্যতম দূষিত নদী হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। বঙ্গোপসাগরের তীরে এই নদী। জোয়ার-ভাটায় খরস্রোতার কারণে এ নদী দূষণ থেকে কিছুটা বেঁচেছিল এবং এর কিছু মাছও পানিতে বেঁচেছিল। এ কর্ণফুলির তীরে সুগার মিলের বর্জ্যে বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থ আছে, এগুলো তরল হয়ে রাসায়নিক বিক্রিয়ায় পানিতে এসে পড়ছে। যার ফলে আগুন লাগার পর যখন থেকেই সুগার মিলের পানি এসে নদীতে পড়ছে, তখন থেকেই মাছ মরা শুরু হয়েছে। মঙ্গলবার থেকেই নদীতে প্রচুর মাছ মরে ভেসে উঠছে। এখন দেখছি, যেসব মাছ মাটির নিচে ডুবে থাকত, সেসবও মরে যাচ্ছে। তিনি বলেন, ‘আমরা কিন্তু নিজেরাই নদীকে ধ্বংস করছি। এ কর্ণফুলি নদীর পানি চট্টগ্রাম শহরের ৭০ লক্ষাধিক মানুষের দৈনন্দিন কাজে ব্যবহার হয়। ওয়াসা নগরীর বাসা-বাড়িতে কর্ণফুলির পানি সরবরাহ করে থাকে। এ রাসায়নিক দ্রব্য কর্ণফুলি হয়ে হালদায় যাওয়ার কারণে দুটি নদীর পানি ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে যাবে। উল্লেখ্য, এস আলম সুপার রিফাইন্ড সুগার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড নামে প্রতিষ্ঠানটির অবস্থান কর্ণফুলি নদীর পাড়ে ইছানগর এলাকায়। প্রায় দশ হাজার বর্গফুটের এ গুদামটি পাঁচ তলা ভবনের সমান উঁচু। সোমবার বিকেল ৪টার দিকে কারখানার ওই গুদামের ছাদের দিকেই প্রথম আগুন দেখা যায়। পরে তা পুরো গুদামে ছড়িয়ে পড়ে। আগুন লাগার সময় কারখানাটি চালু ছিল। সেখানে প্রায় সাড়ে ৫০০ শ্রমিক-কর্মচারী কাজ করেন। আগুন লাগার পর কারখানাটি বন্ধ করে দেয়া হয়।