সৌদি আরবের ওপর হামলা বন্ধ ও যুদ্ধবিরতির বিনিময়ে ইরানের মধ্যস্থতায় হুথিদের ১০০ কোটি ডলার দেওয়ার প্রস্তাব; পাল্টা আলোচনায় ৫১০০ কোটি ডলার ক্ষতিপূরণ দাবি এবং ইয়েমেনের শাসক হিসেবে স্বীকৃতি চাওয়ার খবর।
ইয়েমেনে দীর্ঘদিনের সংঘাতের অবসান ঘটাতে হুথি বিদ্রোহীদের সঙ্গে সমঝোতার চেষ্টা করছে সৌদি আরব। তবে যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনায় সৌদি আরবের আর্থিক প্রস্তাবের তুলনায় হুথিদের পাল্টা দাবি বহুগুণ বেশি বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। প্রথমে সৌদি আরব ইরানের মধ্যস্থতায় হুথিদের ১০০ কোটি মার্কিন ডলার (১ বিলিয়ন ডলার) দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে বলে খবর প্রকাশিত হয়। এর পরপরই হুথিদের পক্ষ থেকে ৫১০০ কোটি ডলার (৫১ বিলিয়ন ডলার) ক্ষতিপূরণ দাবি করার খবর সামনে আসে।
হামলা বন্ধে সৌদির ১ বিলিয়ন ডলারের প্রস্তাব
গত ২৭ অক্টোবর দৈনিক ইত্তেফাকের প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, সৌদি আরবের ওপর হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা বন্ধ এবং যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করতে ইরানের মধ্যস্থতায় ১০০ কোটি ডলার দেওয়ার প্রস্তাব করেছিল রিয়াদ।
ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমের বরাত দিয়ে প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, সৌদি প্রতিরক্ষামন্ত্রী প্রিন্স খালিদ বিন সালমানের তেহরান সফরের সময় এ বিষয়ে আলোচনা হয়। একটি কূটনৈতিক সূত্র দাবি করেছিল, সৌদি মন্ত্রী তাঁর সামরিক পরিবহন বিমানে করে ওই অর্থ তেহরানে নিয়ে এসেছিলেন। তবে অর্থ বহন কিংবা হস্তান্তরের বিষয়টি সৌদি আরবের কোনো কর্মকর্তা নিশ্চিত করেননি।
আলোচনায় তুরস্কের গোয়েন্দাপ্রধান ইব্রাহিম কালিন, পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানসহ সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
এর পেছনে তিন বছর আগে হওয়া একটি সমঝোতার বিষয়ও রয়েছে। ওই সমঝোতা অনুযায়ী, হুথি নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলের সরকারি কর্মচারীদের বেতন এবং অবকাঠামো পুনর্নির্মাণে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার কথা ছিল। বিনিময়ে হুথিদের সৌদি আরবের বিরুদ্ধে হামলা বন্ধ রাখার কথা ছিল। হুথিদের অভিযোগ, সৌদি আরব সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করেনি।
পাল্টা ৫১ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতিপূরণ দাবি
এরপর ৫ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল (WSJ) জানায়, সৌদি আরবের সঙ্গে সংঘাত বন্ধের আলোচনায় হুথিরা ৫১০০ কোটি ডলার ক্ষতিপূরণ দাবি করেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইয়েমেনে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটের দীর্ঘদিনের বিমান হামলা এবং অবরোধের কারণে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতি পুনরুদ্ধারের জন্য এই অর্থ দাবি করেছে হুথিরা। পাশাপাশি ইয়েমেনের শাসক হিসেবে হুথি কর্তৃপক্ষকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়ার দাবিও জানিয়েছে তারা।
অর্থাৎ, সৌদি আরবের কথিত ১ বিলিয়ন ডলারের প্রস্তাবের তুলনায় হুথিদের ৫১ বিলিয়ন ডলারের দাবি ৫১ গুণ বেশি। হুথিদের দাবি শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতিপূরণে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ইয়েমেনের রাজনৈতিক ক্ষমতা ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির প্রশ্ন।
বাব আল-মান্দাব প্রণালি ও সৌদি নিরাপত্তার উদ্বেগ
সৌদি আরবের জন্য পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে লোহিত সাগরে হুথিদের সামরিক তৎপরতার কারণে। WSJ-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, সৌদি তেলবাহী জাহাজে হামলা এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দাব প্রণালির আশপাশে হুথিদের অবস্থান শক্তিশালী হওয়ায় রিয়াদ নতুন করে আলোচনার পথ খুঁজছে।
বাব আল-মান্দাব প্রণালি লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের সংযোগস্থল। ইউরোপ, এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং জ্বালানি পরিবহনে এই নৌপথের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। এখানে হুথিদের সামরিক প্রভাব সৌদি আরবের তেল পরিবহন, সমুদ্রবাণিজ্য এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য বড় উদ্বেগ তৈরি করেছে।
অন্যদিকে, ইয়েমেনে নতুন করে বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালানোও সৌদি আরবের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। দীর্ঘদিনের সংঘাতেও হুথিদের সামরিক সক্ষমতা পুরোপুরি দমন করা সম্ভব হয়নি।
৫১ বিলিয়ন ডলারের দাবি অস্বীকার সৌদি আরবের
তবে হুথিদের ৫১ বিলিয়ন ডলারের দাবি নিয়ে সৌদি আরবের পক্ষ থেকে আপত্তি এসেছে। ৫ নভেম্বর সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জনকূটনীতি বিষয়ক উপমন্ত্রী রায়েদ ক্রিমলি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বক্তব্যে WSJ-এর প্রতিবেদনটি সরাসরি অস্বীকার করেন। তাঁর ভাষায়, হুথিদের পক্ষ থেকে এমন দাবির খবরের কোনো সত্যতা নেই এবং এটি সংবাদমাধ্যমটির লেখক বা তাদের কথিত সূত্রের কল্পনাপ্রসূত বক্তব্য।
অন্যদিকে, হুথিদের ঘনিষ্ঠ এক সাংবাদিকও দ্য নিউ আরব-এর কাছে ৫১ বিলিয়ন ডলারের অঙ্ক এবং সৌদি স্বীকৃতির দাবির বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছেন। ফলে আলোচনায় ঠিক কী পরিমাণ অর্থ দাবি করা হয়েছে, তা নিয়ে এখনো বিতর্ক রয়েছে।
সব মিলিয়ে, সৌদি আরবের কথিত ১ বিলিয়ন ডলারের প্রস্তাব এবং হুথিদের ৫১ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতিপূরণ দাবির খবর ইয়েমেন সংঘাতের নতুন কূটনৈতিক সমীকরণ সামনে এনেছে। তবে ১ বিলিয়ন ডলারের প্রস্তাব যেমন স্বাধীনভাবে নিশ্চিত নয়, তেমনি ৫১ বিলিয়ন ডলারের দাবিও সৌদি আরব আনুষ্ঠানিকভাবে অস্বীকার করেছে। এখন পর্যন্ত কোনো চূড়ান্ত যুদ্ধবিরতি বা আর্থিক সমঝোতার ঘোষণা আসেনি।