বছরে ১ লাখ কর্মী নেওয়ার দাবি প্রত্যাখ্যান টোকিওর, ইউনূস সরকারের পিআর স্টান্টের দায় মেটাচ্ছে বিএনপি সরকার

প্রকাশিতঃ অক্টোবর ৩০, ২০২৬ | ৭:৫৯ অপরাহ্ন
অনলাইন নিউজ ডেক্স

ইউনূস সরকারের আমলে জাপানে ৫ বছরে ১ লাখ বাংলাদেশি কর্মী নেওয়ার পরিকল্পনা নিয়ে ব্যাপক প্রচার; এবার বার্ষিক ১ লাখ কর্মী নিয়োগের খবরও নাকচ করল জাপান। জনশক্তি রপ্তানির সম্ভাবনাকে রাজনৈতিক প্রচারণায় রূপ দেওয়ার অভিযোগ, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি নিয়ে উদ্বেগ। জাপানে প্রতিবছর ১ লাখ বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগের কোনো চুক্তি বা প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়নি বলে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে দেশটির সরকার। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক জাপান সফরকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের কয়েকটি গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন খবর ছড়িয়ে পড়ার পর ২৯শে অক্টোবর, বৃহস্পতিবার জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করে। জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রেস সচিব তোশিহিরো কিতামুরা এক বিবৃতিতে জানান, বাংলাদেশ থেকে এক লাখ কর্মী নেওয়ার বিষয়ে জাপান সরকার সম্মত হয়েছে বলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত তথ্য সম্পূর্ণ অসত্য। এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি। জাপানের এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে দুই দেশের মধ্যে কর্মী নিয়োগ নিয়ে প্রচারিত বড় ধরনের প্রতিশ্রুতির খবরের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে এই ঘটনা শুধু সাম্প্রতিক একটি ভুল সংবাদ প্রচারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর পেছনে রয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ইউনূসের সময় থেকে জাপানে এক লাখ কর্মী পাঠানোর পরিকল্পনা নিয়ে ধারাবাহিক প্রচারণার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট। ইউনূস সরকারের আমলে ১ লাখ কর্মী পাঠানোর ঘোষণা ২০২৫ সালের ২৯শে মে ইউনূসের জাপান সফরের সময় টোকিওতে আয়োজিত ‘বাংলাদেশ সেমিনার অন হিউম্যান রিসোর্সেস’ অনুষ্ঠানে জাপানে পাঁচ বছরে অন্তত এক লাখ বাংলাদেশি কর্মী নেওয়ার পরিকল্পনার কথা প্রচার করা হয়। ওই অনুষ্ঠানে দুটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছিল। একটি বাংলাদেশ সরকারের জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) এবং জাপান-বাংলাদেশ যৌথ উদ্যোগের প্রতিষ্ঠান Kaicom Dream Street-এর মধ্যে। অন্যটি BMET, জাপানের National Business Support Combined Cooperatives (NBCC) এবং Japan Bangla Bridge Recruiting Agency-এর মধ্যে। অনুষ্ঠানে NBCC-এর চেয়ারম্যান মিকিও কেসাগায়ামা আগামী পাঁচ বছরে এক লাখের বেশি বাংলাদেশি কর্মী গ্রহণের প্রস্তুতির কথা জানিয়েছিলেন। ইউনূসও বিষয়টিকে বাংলাদেশিদের জন্য জাপানে কাজের সুযোগ সম্প্রসারণের বড় সম্ভাবনা হিসেবে তুলে ধরেছিলেন। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই ঘোষণা জাপান সরকারের সঙ্গে বাংলাদেশের এমন কোনো রাষ্ট্রীয় চুক্তি ছিল না, যার মাধ্যমে জাপান সরকার বাধ্যতামূলকভাবে পাঁচ বছরে বা প্রতিবছর নির্দিষ্টসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগের নিশ্চয়তা দিয়েছিল। এটি ছিল মূলত জাপানের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর আগ্রহ এবং সমঝোতার ভিত্তিতে তৈরি কর্মসংস্থান পরিকল্পনা। পড়ুন: ইউনূসের জাপান সফরের ১৭ মাসঃ পাঁচ বছরে জাপানে ১ লাখ বাংলাদেশি কর্মী পাঠানোর চুক্তির অগ্রগতি কতোটা? ২০২৫ সালের ২৮শে অক্টোবর অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় আরও জানায়, জাপানের NBCC প্রতিনিধিদল ইউনূসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে পাঁচ বছরে এক লাখের বেশি কর্মী নিয়োগের পরিকল্পনার অগ্রগতি তুলে ধরেছে। তখন প্রথম পর্যায়ে ২০২৬ সালে দুই হাজার, ২০২৭ সালে ছয় হাজার এবং ২০২৮ সালে ১৮ হাজার কর্মী নিয়োগের পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়েছিল। সমঝোতা আর সরকারি নিয়োগের নিশ্চয়তা এক নয় ২০২৬ সালের ১৭ই অক্টোবর বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে কর্মসংস্থান ও দক্ষতা উন্নয়নবিষয়ক একটি সহযোগিতা স্মারক (ESDP-MOC) স্বাক্ষরিত হয়। এর আওতায় ২০২৭ সালের ১ এপ্রিল থেকে বাংলাদেশি কর্মীদের জাপানে পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার কথা। চুক্তিটির প্রাথমিক মেয়াদ পাঁচ বছর, যা পারস্পরিক সম্মতিতে আরও পাঁচ বছর বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। এই চুক্তির উদ্দেশ্য হচ্ছে কর্মীদের দক্ষতা উন্নয়ন, নিয়োগপ্রক্রিয়ায় সহযোগিতা এবং জাপানে কর্মরত বাংলাদেশিদের অধিকার ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা। কিন্তু এতে প্রতিবছর এক লাখ কর্মী নিয়োগের কোনো বাধ্যতামূলক শর্ত নেই। অর্থাৎ, কর্মী পাঠানোর সুযোগ সৃষ্টি, প্রশিক্ষণ ও নিয়োগে সহযোগিতা এবং নির্দিষ্টসংখ্যক কর্মী গ্রহণের রাষ্ট্রীয় নিশ্চয়তা—এই তিনটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। প্রচারণার দায় কার? ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জাপানে এক লাখ কর্মী পাঠানোর সম্ভাবনাকে বড় সাফল্য হিসেবে তুলে ধরতে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং ব্যাপক প্রচারণা চালিয়েছিল। কিন্তু বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের আগ্রহ ও সমঝোতাকে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে নিশ্চিত নিয়োগের প্রতিশ্রুতি হিসেবে উপস্থাপন করা হলে সেটি জনমনে ভুল প্রত্যাশা তৈরি করতে পারে। সাম্প্রতিক ঘটনায় আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাপান সফরকে কেন্দ্র করে প্রতিবছর এক লাখ কর্মী নেওয়ার খবর প্রচারিত হওয়ার পর জাপান সরকারকে প্রকাশ্যে সেটি অস্বীকার করতে হয়েছে। অথচ দুই দেশের যৌথ বিবৃতিতে কর্মী চলাচল বাড়ানোর বিষয়ে পারস্পরিক আগ্রহের কথা থাকলেও নির্দিষ্ট সংখ্যায় কর্মী নিয়োগের কোনো প্রতিশ্রুতি ছিল না। এখানে রাজনৈতিক প্রচারণা ও রাষ্ট্রীয় কূটনীতির পার্থক্যটি স্পষ্ট করা জরুরি। আগের সরকারের প্রচারিত পরিকল্পনাকে যাচাই না করে নতুন সরকারের সফরের সাফল্য হিসেবে পুনরায় উপস্থাপন করা হলে তা যেমন বিভ্রান্তিকর, তেমনি আন্তর্জাতিক অংশীদারের কাছেও বাংলাদেশের সরকারি বক্তব্যের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ন করতে পারে। প্রচারণার খেসারত দিতে হচ্ছে বাংলাদেশকে ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইংয়ের প্রচারিত এক লাখ কর্মী পাঠানোর পরিকল্পনা যদি বাস্তব চুক্তি ও নিয়োগের নিশ্চয়তা ছাড়াই রাজনৈতিক প্রচারণার অংশ হয়ে থাকে, তাহলে সেটিকে নিছক জনসংযোগমূলক সাফল্য হিসেবে দেখানোর প্রবণতা শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের জন্য ক্ষতিকর হয়েছে। একে প্রচারণামূলক সাফল্য বা ‘পাবলিসিটি স্টান্ট’ হিসেবে সমালোচনা করার যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে। আরও উদ্বেগজনক হলো, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরও সেই প্রচারণার ধারাবাহিকতায় একই ধরনের অতিরঞ্জিত তথ্য ছড়িয়ে পড়েছে। ফলে আগের সরকারের প্রচারণার দায় বর্তমান সরকারকেও বহন করতে হচ্ছে। তবে তারেক রহমানের সরকার বা তাঁর প্রেস উইং ইচ্ছাকৃতভাবে এই তথ্য প্রচার করেছে কিংবা আগের প্রচারণার সঙ্গে তাদের কোনো সমন্বয় ছিল—এমন অভিযোগের পক্ষে এখন পর্যন্ত স্বাধীন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। একটি দেশের শ্রমবাজারের সম্ভাবনা নিয়ে প্রচারণা চালানো আর আন্তর্জাতিক চুক্তির নামে অতিরঞ্জিত দাবি করা এক বিষয় নয়। বিশেষ করে জাপানের মতো গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অংশীদার যখন বাংলাদেশের প্রচারিত তথ্য প্রকাশ্যে প্রত্যাখ্যান করে, তখন সেটি শুধু একটি সংবাদ সংশোধনের ঘটনা থাকে না; বরং দেশের কূটনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা ও আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির জন্যও বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করে। বাংলাদেশের জন্য এখন সবচেয়ে জরুরি হলো রাজনৈতিক প্রচারণার পরিবর্তে বাস্তব কর্মসংস্থান, দক্ষতা উন্নয়ন এবং যাচাইযোগ্য কূটনৈতিক সাফল্যকে গুরুত্ব দেওয়া। কারণ এক লাখ কর্মী পাঠানোর প্রতিশ্রুতির প্রচার দিয়ে সাময়িক রাজনৈতিক সাফল্য অর্জন করা গেলেও, বিদেশি সরকারের প্রকাশ্য অস্বীকৃতির পর সেই প্রচারণার খেসারত দিতে হয় পুরো দেশকে।