বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণ পিছিয়ে দিল জাতিসংঘ, নতুন সময়সীমা ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর

প্রকাশিতঃ অক্টোবর ৩১, ২০২৬ | ৮:১৫ অপরাহ্ন
অনলাইন নিউজ ডেক্স

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে প্রস্তাব গৃহীত; বাড়তি তিন বছর শুল্কমুক্ত বাজারসুবিধা ধরে রেখে অর্থনৈতিক সংস্কার ও প্রস্তুতির সুযোগ পাচ্ছে বাংলাদেশ   বিশেষ প্রতিবেদক। ঢাকা, ৩১ অক্টোবর, ২০২৬। স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ আরও তিন বছর পিছিয়ে দিয়েছে জাতিসংঘ। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে বাংলাদেশের উত্তরণের প্রস্তুতিকাল বাড়ানোর প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়েছে। ফলে পূর্বনির্ধারিত ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বরের পরিবর্তে ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর এলডিসি থেকে উত্তরণ ঘটবে বাংলাদেশের। নিউইয়র্কে স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের এক পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। একই সঙ্গে নেপালের এলডিসি উত্তরণের সময়সীমাও তিন বছর বাড়ানো হয়েছে। বাংলাদেশ ও নেপালের উত্তরণ পিছিয়ে দেওয়ার প্রস্তাবটি জাতিসংঘের ৭৭টি উন্নয়নশীল দেশের জোট জি-৭৭ ও চীনের পক্ষে উরুগুয়ের প্রতিনিধি সাধারণ পরিষদে উত্থাপন করেন। পরে কণ্ঠভোটে প্রস্তাবটি গৃহীত হয়। কোনো দেশ এ প্রস্তাবের বিরোধিতা করেনি। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি ও বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। প্রস্তাবের পক্ষে ফ্রান্স, কানাডা এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের পক্ষে আয়ারল্যান্ড সমর্থন জানায়। তবে এসব দেশ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করে। বাংলাদেশের নতুন বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতিকাল তিন বছর বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়। গত ১৮ ফেব্রুয়ারি সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে জাতিসংঘের কাছে ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত সময় বাড়ানোর আবেদন করে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও এ বিষয়ে জাতিসংঘ মহাসচিবের কাছে চিঠি পাঠিয়ে বাংলাদেশের আবেদনের পক্ষে সমর্থন চান। বাংলাদেশের আবেদনে বলা হয়, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবর্তন, অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা, বৈশ্বিক বাণিজ্যের অনিশ্চয়তা, ভূরাজনৈতিক সংঘাত, জ্বালানি ও সরবরাহব্যবস্থার সংকটসহ নানা কারণে এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতি বাধাগ্রস্ত হয়েছে। দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি স্থিতিশীল করা, চলমান সংস্কার কার্যক্রম সম্পন্ন করা এবং রপ্তানি প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য অতিরিক্ত সময় প্রয়োজন। এর আগে জাতিসংঘের উন্নয়ন নীতিবিষয়ক কমিটি (সিডিপি) বাংলাদেশের আবেদনের বিষয়টি পর্যালোচনা করে। পরে জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ (ইকোসক) গত ২১ জুলাই বিষয়টি চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য সাধারণ পরিষদে পাঠানোর সুপারিশ করে। সর্বশেষ সাধারণ পরিষদের অনুমোদনের মধ্য দিয়ে তিন বছর সময় বাড়ানোর প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলো। জাতিসংঘের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বর্ধিত প্রস্তুতিকালে বাংলাদেশকে অভ্যন্তরীণ সংস্কার কার্যক্রম জোরদার করার পাশাপাশি জাতীয় মসৃণ উত্তরণ কৌশল (স্মুথ ট্রানজিশন স্ট্র্যাটেজি) বাস্তবায়ন করতে হবে। এ কার্যক্রমের অগ্রগতি সম্পর্কে জাতিসংঘের উন্নয়ন নীতিবিষয়ক কমিটিকে নিয়মিত প্রতিবেদন দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।   কেন গুরুত্বপূর্ণ এই তিন বছর এলডিসি থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশের রপ্তানি খাতকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হতে পারে। বর্তমানে স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বাংলাদেশ বিভিন্ন দেশের বাজারে শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত বাণিজ্যসুবিধা পেয়ে থাকে। উত্তরণের পর এসব বিশেষ সুবিধার একটি বড় অংশ হারানোর আশঙ্কা রয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানির প্রায় ৭৩ শতাংশ এলডিসি-সংশ্লিষ্ট বিশেষ বাণিজ্যসুবিধার আওতায় রয়েছে। ৩৮টি দেশ ও বাণিজ্যিক জোটের বাজারে বাংলাদেশ এ ধরনের সুবিধা ভোগ করছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক, ওষুধ ও অন্যান্য রপ্তানিনির্ভর শিল্পের জন্য এ সুবিধা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এলডিসি উত্তরণের পর ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ গুরুত্বপূর্ণ বাজারে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানিতে শুল্ক বাড়তে পারে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা ধরে রাখা কঠিন হতে পারে। পাশাপাশি রপ্তানি ভর্তুকি, মেধাস্বত্ব এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যসংক্রান্ত কিছু বিশেষ সুবিধার ক্ষেত্রেও নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে বাংলাদেশকে। তিন বছর সময় বাড়ানোর ফলে বাংলাদেশ আপাতত বিদ্যমান এলডিসি-সংশ্লিষ্ট বাণিজ্যসুবিধা ধরে রাখার সুযোগ পাবে। এই সময়ে বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদন, রপ্তানি বহুমুখীকরণ, উৎপাদন ব্যয় কমানো, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জনের সুযোগ তৈরি হয়েছে। উল্লেখ্য, বাংলাদেশ ১৯৭৫ সালে জাতিসংঘের স্বল্পোন্নত দেশের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়। ২০১৮ সালে প্রথমবার এবং ২০২১ সালে দ্বিতীয়বার জাতিসংঘের নির্ধারিত তিনটি মানদণ্ড—মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত ভঙ্গুরতা—পূরণ করে দেশটি। করোনাভাইরাস মহামারির কারণে এর আগে উত্তরণের প্রস্তুতিকাল দুই বছর বাড়ানো হয়েছিল। সেই অনুযায়ী ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বর বাংলাদেশের এলডিসি থেকে উত্তরণের কথা ছিল। নতুন সিদ্ধান্তের ফলে সেই সময়সীমা আরও তিন বছর বাড়ল। তবে এই বাড়তি সময়কে কেবল উত্তরণ পিছিয়ে দেওয়ার সুযোগ হিসেবে নয়, বরং অর্থনীতির দুর্বলতা কাটিয়ে একটি টেকসই ও প্রতিযোগিতামূলক উন্নয়নশীল দেশে পরিণত হওয়ার প্রস্তুতি হিসেবে কাজে লাগানোই এখন বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।