ধর্মের নামে শিশুকে ভয় দেখানো, নির্যাতন-কে শিশুর মানসিক ক্ষতির কারণ বলছে জাপান সরকার

প্রকাশিতঃ অক্টোবর ৯, ২০২৬ | ৫:৫২ পূর্বাহ্ন
অনলাইন নিউজ ডেক্স

ধর্মীয় বিশ্বাসের নামে শিশুকে ভয় দেখানো বা নির্যাতন করাকে জাপান সরকার সম্প্রতি শিশু নির্যাতনের আওতায় এনেছে। এই উদ্যোগের পর বাংলাদেশের মাদ্রাসায় ধর্মশিক্ষার নামে শিশুদের ওপর যে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের ঘটনার চিত্র দেখা যায়, তা গভীরভাবে অনুসন্ধানের দাবি রাখে। জাপানের নির্দেশিকা কী বলছে জাপানের নির্দেশিকায় নরকের ভয় বা ঐশ্বরিক শাস্তির হুমকি দেওয়া, ধর্মীয় নিয়ম না মানলে পরিবারে অসুখ ও দুর্ভাগ্য নেমে আসার ভয় দেখানো, ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে শিশুর সামাজিক জীবন ও ভবিষ্যৎ পেশা সীমিত করা এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত করাকে সমস্যাজনক আচরণ বলা হয়েছে। ২০২২ সালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে হত্যাকাণ্ডের পর দ্বিতীয় প্রজন্মের অনুসারীদের অভিজ্ঞতা সামনে এলে এই নজরদারি বাড়ে। সরকার ধর্মীয় স্বাধীনতা স্বীকার করলেও বলেছে, এর অজুহাতে শিশুর মানসিক ক্ষতি করা যাবে না। বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে ঝুঁকি শিশুমনোবিজ্ঞান ও মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করা গবেষকদের মতে, শৈশবে দীর্ঘস্থায়ী ভয়, হুমকি ও মানসিক নিপীড়ন শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশ ও আবেগ নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতাকে প্রভাবিত করতে পারে। গবেষণায় এর সঙ্গে উদ্বেগ, বিষণ্নতা, ট্রমা-পরবর্তী মানসিক চাপ, আত্মবিশ্বাসের অভাব ও সম্পর্ক গড়তে অক্ষমতার সম্পর্ক পাওয়া গেছে। কিছু ক্ষেত্রে ভয় ও শাস্তির পরিবেশে বড় হওয়া শিশুর মধ্যে সহানুভূতির ঘাটতি, রাগ ও আগ্রাসী আচরণ তৈরি হতে পারে। কেউ কেউ ক্ষমতা ও নিয়ন্ত্রণের এই ছক পরবর্তী জীবনে অন্যের ওপর প্রয়োগ করতে পারে। শৈশবের নির্যাতনকে সমাজবিরোধী আচরণ ও সহিংসতার একটি ঝুঁকির কারণ হিসেবে গণ্য করা হয়। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, এটি সরাসরি কার্যকারণ সম্পর্ক নয়। সাইকোপ্যাথি বা মনোবিকারগ্রস্ত সহিংসতার পেছনে জিনগত বৈশিষ্ট্য, পারিবারিক পরিবেশ, সামাজিক অবস্থা ও অন্যান্য কারণও কাজ করে। ভয়ের পরিবেশে বড় হওয়া অধিকাংশ শিশুই সহিংস হয়ে ওঠে না। বরং তাদের বেশি দেখা যায় নিজের প্রতি ক্ষতিকর মানসিক অবস্থায়, যেমন বিষণ্নতা ও আত্মগ্লানি। সমাজের করণীয় জাপানের এই উদ্যোগকে বিশ্লেষকরা শিশুর মানসিক সুরক্ষার দিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। তাঁদের মতে, ধর্মীয় বিশ্বাস ও শিশুর মানসিক নিরাপত্তা পরস্পরবিরোধী নয়। ভয়ের বদলে ভালোবাসা, ব্যাখ্যা ও আলোচনার মাধ্যমে নৈতিক শিক্ষা দেওয়াই শিশুর সুস্থ বিকাশের জন্য কার্যকর। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট বিভিন্ন সময়ে সংবাদমাধ্যমে মাদ্রাসায় শিশুদের বেত্রাঘাত, শিকল বা বেঁধে রাখা, যৌন নির্যাতন এবং নির্যাতনে আহত বা নিহত হওয়ার খবর এসেছে। ২০১১ সালে হাইকোর্ট মাদ্রাসাসহ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শারীরিক ও মানসিক শাস্তি নিষিদ্ধ করেছিলেন। শিশু অধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগ, বাস্তবে এর প্রয়োগ দুর্বল। বিশেষ করে বেসরকারি ও আবাসিক মাদ্রাসায় নজরদারির ঘাটতি রয়েছে এবং ভুক্তভোগী পরিবারগুলো সামাজিক চাপ ও লোকলজ্জার কারণে অনেক সময় অভিযোগ করে না। কিছু ক্ষেত্রে শাস্তিকে “আদব শেখানো” বা “দ্বীনের তালিম”-এর অংশ হিসেবে দেখা হয়। জাপানের নির্দেশিকায় চিহ্নিত আচরণের সঙ্গে এর মিল হলো, ধর্মীয় বৈধতার দোহাই দিয়ে শিশুর ওপর ভয় ও নিয়ন্ত্রণ চাপিয়ে দেওয়া হয়। শিশুদের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব মনোবিজ্ঞানের গবেষণা বলছে, শৈশবে দীর্ঘস্থায়ী ভয়, মারধর ও অপমান শিশুর আবেগ নিয়ন্ত্রণ ও মস্তিষ্কের বিকাশকে প্রভাবিত করতে পারে। এর ফলে সাধারণত দেখা দিতে পারে: – উদ্বেগ, বিষণ্নতা ও ট্রমা-পরবর্তী মানসিক চাপ – আত্মবিশ্বাসের অভাব ও পড়াশোনায় অনীহা – বিশ্বাস ও সম্পর্ক গড়তে অক্ষমতা – নির্যাতনকারীর প্রতি ভয় এবং একই সঙ্গে ধর্মশিক্ষা বা ধর্মের প্রতি বিরূপ মনোভাব কিছু ক্ষেত্রে নির্যাতিত শিশু বড় হয়ে রাগ, আগ্রাসী আচরণ ও সহানুভূতির ঘাটতি দেখাতে পারে। শৈশবে নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের কেউ কেউ পরে একই আচরণ অন্যের ওপর প্রয়োগ করে, যাকে বিশেষজ্ঞরা সহিংসতার চক্র বলেন। এর মধ্যে নির্যাতনের শিকার ছাত্র পরে শিক্ষক হয়ে একই পদ্ধতি অনুসরণ করার ঝুঁকিও আছে। বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, শৈশবের নির্যাতন সহিংসতার ঝুঁকির একটি কারণ, কিন্তু এটি নিশ্চিত পরিণতি নয়। সাইকোপ্যাথি বা স্যাডিস্টিক প্রবণতার পেছনে জিনগত বৈশিষ্ট্য, পারিবারিক পরিবেশ ও সামাজিক অবস্থাও ভূমিকা রাখে। নির্যাতনের শিকার বেশিরভাগ শিশুর ক্ষেত্রে ক্ষতি দেখা যায় বিষণ্নতা, ভয় ও আত্মগ্লানির মতো নিজের প্রতি ক্ষতিকর রূপে। তাঁরা আরও মনে করিয়ে দেন, সব মাদ্রাসা এমন নয়। অনেক মাদ্রাসায় শিশুদের যত্ন ও সহমর্মিতার সঙ্গে শেখানো হয়। সমস্যা ধর্মশিক্ষায় নয়, বরং শিক্ষাদানের পদ্ধতি ও জবাবদিহির অভাবে। জাপানের উদাহরণও ভিন্ন প্রেক্ষাপটের, তাই এটি তুলনা হিসেবে প্রাসঙ্গিক হলেও এক নয়। করণীয় কী শিশু অধিকার বিশেষজ্ঞরা নিচের পদক্ষেপের কথা বলছেন: – মাদ্রাসাসহ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শারীরিক ও মানসিক শাস্তি নিষিদ্ধের আইন কার্যকর করা – আবাসিক মাদ্রাসায় নিয়মিত পরিদর্শন ও অভিযোগ জানানোর নিরাপদ ব্যবস্থা রাখা – শিক্ষকদের শিশুবান্ধব শিক্ষণ পদ্ধতির প্রশিক্ষণ দেওয়া – অভিভাবকদের সচেতন করা এবং নির্যাতনের ঘটনা গোপন না করে প্রতিকার চাওয়ার সংস্কৃতি গড়ে তোলা – নির্যাতিত শিশুদের জন্য কাউন্সেলিং ও চিকিৎসা নিশ্চিত করা বিশ্লেষকদের মতে, ভয়ের বদলে ভালোবাসা ও ব্যাখ্যার মাধ্যমে শেখালে ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষা শিশুর মনে স্থায়ী ও ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।