পাসপোর্ট অফিসের ঘুস বাণিজ্য

প্রকাশিতঃ মে ২০, ২০২৬ | ৭:৫৭ পূর্বাহ্ণ
অনলাইন নিউজ ডেক্স

একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রে নাগরিক অধিকারের অন্যতম প্রধান দলিল হলো পাসপোর্ট। কিন্তু আমাদের দেশের পাসপোর্ট অফিসগুলো যেন একেকটি প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে। সোমবার প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা যায়, পাসপোর্ট অফিসের ঘুস ভাগাভাগিতে ‘শিয়ালের আলু ভাগের’ মতো এক বিশেষ পদ্ধতি দীর্ঘদিন ধরে চালু আছে। সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশনের জিজ্ঞাসাবাদে পাসপোর্ট অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তার মুখ থেকে যেসব তথ্য বেরিয়ে এসেছে, তা নিঃসন্দেহে দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠানটির সুশাসন ও জবাবদিহিতার কঙ্কালসার রূপটিকেই উন্মোচিত করেছে। প্রতিষ্ঠানটিতে যেভাবে খাতা খুলে হিসাব কষে, চ্যানেল মাস্টার নিয়োগ করে ঘুসের টাকা ভাগাভাগি হয়, তা রূপকথার গল্পকেও হার মানায়। বস্তুত এটি বিচ্ছিন্ন কোনো দুর্নীতি নয়, বরং উপর থেকে নিচ পর্যন্ত বিস্তৃত একটি সুসংগঠিত অপরাধ। প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, পাসপোর্ট অফিসগুলোর ঘুস বাণিজ্য এতটাই সুনির্দিষ্ট যে, সেখানে ক্যাটাগরিভিত্তিক পোস্টিং এবং ঘুসের রেট নির্ধারিত থাকে। এ, বি ও সি ক্যাটাগরির অফিসবিন্যাস মূলত জনসেবার সুবিধার্থে নয়, বরং পোস্টিং বাণিজ্যের দরদাম ঠিক করতে ব্যবহৃত হয়, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। দিনে এক হাজার-দেড় হাজার আবেদন জমা পড়ার হিসাবে সপ্তাহে অন্তত ৪০ লাখ আর মাসে কোটি টাকার উপর ঘুস ওঠার বাস্তবতাও হতবাক করার মতো। সিন্ডিকেটটি এতটাই শক্তিশালী যে, এ বিপুল অর্থের ভাগ শুধু অফিসের কেরানি বা নিরাপত্তা প্রহরীর পকেটেই যায় না; এর একটি বড় অংশ বিশেষ প্যাকেটে পৌঁছে যায় রাজধানীর আগারগাঁওয়ের প্রধান কার্যালয়ের ক্ষমতাধর কর্মকর্তাদের টেবিলেও। এমনকি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, মাঠ পর্যায়ের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অসাধু সদস্য এবং স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের পকেটেও এই অবৈধ অর্থ নিয়মিত জমা পড়ে। পরিতাপের বিষয়, প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) ২০১৯ সালের সর্বশেষ তদন্ত এবং ২৫ জন শীর্ষ দুর্নীতিবাজের তালিকাও এই সিন্ডিকেট ভেঙে দিতে পারেনি। রাজনৈতিক প্রভাব, উচ্চপর্যায়ের তদবির আর রহস্যজনক দায়মুক্তির সনদ ব্যবহার করে দুর্নীতিবাজরা পরবর্তী সময়ে পার পেয়ে গেছে। শুধু পার পাওয়াই নয়, অভিযুক্ত কর্মকর্তারা যখন পুনরায় ঘুসের প্রধান কেন্দ্রে প্রাইজ পোস্টিং পান, তখন দুর্নীতির এই জাল কতটা শক্ত, তা স্পষ্টতই বোঝা যায়। কাজেই রাঘববোয়ালদের বহাল তবিয়তে রেখে দুর্নীতি দমনের উদ্যোগের পরিণতি যে কখনোই সফল হবে না, তা বলাই বাহুল্য। আমরা মনে করি, সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে লোকদেখানো অভিযান চালানো হলে এ ঘুসের চ্যানেল কিছুটা স্তিমিত হবে বটে; কিন্তু সাধারণ মানুষের ভোগান্তিই তাতে বহুগুণ বেড়ে যাবে। কারণ, এই পুরো ব্যবস্থাটি এমনভাবে সাজানো হয়েছে, যেখানে ঘুস না দিলে ফাইল আটকে যায়, আর ঘুস দিলে সব নিয়ম সোজা হয়ে যায়। কাজেই সিন্ডিকেট দমনে গাছের গোড়া কেটে আগায় পানি ঢাললে কোনো লাভ হবে না। পাসপোর্ট অফিসের এই প্রাতিষ্ঠানিক লুটপাট বন্ধ করতে হলে সবার আগে পোস্টিং বাণিজ্য এবং উচ্চপর্যায়ের সুরক্ষাকবচ ভাঙতে হবে। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে নিতে হবে কঠোর ব্যবস্থা। পাসপোর্ট অফিসের এই ভয়াবহ ঘুস বাণিজ্য রোধে সরকার কঠোর পদক্ষেপ নেবে, এটাই প্রত্যাশা।